শিশু ধর্ষণের অভিযোগ, টাকা-হুমকি দিয়ে মীমাংসার চেষ্টা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ২ বছর ১০ মাস বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক সপ্তাহ আগের এ ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাধায় থানায় মামলা করতে পারছিল না শিশুটির পরিবার। শত শত গ্রামবাসীর সামনে তিন দফায় ওই শিশু ও তার পরিবারকে ডেকে এনে দুই লাখ টাকায় মীমাংসার চেষ্টাও হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পরিবারটি গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে থানায় মামলা করেছেন।

মঙ্গলবার সকালে এ ঘটনায় হওয়া মামলায় পুলিশ অভিযুক্ত সানি আলম (২২) নামের এক আসামিকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। সানি আলম পেশায় একজন বিদ্যুৎ–মিস্ত্রি। তাঁর বাড়ি রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা ইউনিয়নে।

শিশুটির মা প্রথম আলোকে জানান, গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেশী ওই তরুণ শিশুটিকে খেলার কথা বলে নিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটি ফিরে এসে তাঁকে একথা জানালে সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাইফুল ইসলামের কাছে ছুটে যান। এরপর তিনি এ ঘটনায় মামলা করতে না দিয়ে গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক লোক ডেকে সালিসের মাধ্যমে বিচারের চেষ্টা করেন। তারা বিচার না মেনে বাড়ি চলে এলে পরদিন সকালে আবার মীমাংসার চেষ্টা করেন ওয়ার্ড সদস্য সাইফুল ও গ্রামের মাতবর বাদল হোসেন।শিশুটির দাদি জানান, সালিস ছেড়ে চলে আসার পর থকেই তাঁদের একধরনের নজরবন্দী করে ফেলা হয়। কোনোভাবেই তাঁদের গ্রাম থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছিল না। বিচার না মানলে ভবিষ্যতে দেখে নেওয়াসহ তাঁদের পরিবারের প্রয়োজনে পাশে না থাকার হুমকি দিয়েছেন সালিসের বিচারকেরা। অবশেষে সোমবার সকালে পালিয়ে এসে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) ঘটনা সম্পর্কে জানান তিনি।

নাতনির ধর্ষণের পর ওই বৃদ্ধার পুরো পরিবারই বিপদে পড়েছে। সালিস না মেনে ইউএনও কার্যালয়ে যাওয়ায় গালাগাল করা হয়েছে তাঁদের।

ইউএনও শাহ নুসরাত জাহান প্রথম আলোকে জানান, শিশুটিকে কোলে করে নিয়ে এসেছিলেন বৃদ্ধা। ভীত–সন্ত্রস্ত শিশুটি ভয়ে কাঁপছিল। এক আনসার সদস্যসহ উপজেলার দুই কর্মকর্তাকে তিনি ঘটনাস্থলে পাঠান। তাঁরা ওই যুবককে খুঁজে না পেয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। মঙ্গলবার সকালে সেই ওয়ার্ড সদস্যসহ গ্রামের কিছু মুরব্বি অভিযুক্ত সানিকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে উপজেলা কার্যালয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরপর মামলা হয়। সালিস বসিয়ে দুই লাখ টাকায় এ ঘটনা মীমাংসার বিষয়ে শুনেছেন বলে জানান তিনি।

ইউএনওকে জানানোর পরও সালিসে অপমান ও হুমকির শিকার হয়েছেন বলে জানান শিশুটির দাদি। তিনি বলেন, সোমবার রাতে প্রায় তিন শতাধিক গ্রামবাসীর সামনে তৃতীয়বারের মতো তাঁদের ডেকে আনা হয়। রাত দুইটা পর্যন্ত মীমাংসার চেষ্টা চলে। সেখানে দুই লাখ টাকায় ঘটনার মীমাংসার প্রস্তাব দেন ওয়ার্ড সদস্য সাইফুল ইসলাম।সোমবার রাতের সালিসে থাকা ওই এলাকার এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, নাতনির ধর্ষণের পর ওই বৃদ্ধার পুরো পরিবারই বিপদে পড়েছে। সালিস না মেনে ইউএনও কার্যালয়ে যাওয়ায় গালাগাল করা হয়েছে তাঁদের। মামলা হলেও এ মামলায় এলাকার কেউ শিশুর পরিবারের পক্ষে সাক্ষী দেবেন না বলে হুমকি দিয়েছেন সালিসের বিচারকেরা।

শিশুর পরিবারকে মামলা করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে ভুলতা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর গত মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাতেই তাঁর কার্যালয়ে গ্রামবাসীকে নিয়ে বসেছিলেন। সালিসের মাধ্যমে অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেছেন। তারপর আর মীমাংসার চেষ্টা করেননি। শিশু ধর্ষণের ঘটনা সালিসের মাধ্যমে বিচার করা যায় কি না, জানতে চাইলে ওই ওয়ার্ড সদস্য বলেন, ‘আমি একা কিছুই করিনি। এখানে আরও অনেকেই ছিলেন।’

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, এ ঘটনায় হওয়া মামলায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। শিশুর পরিবারকে হুমকির বিষয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.

About Author